যুক্তরাষ্ট্রের চলমান শাটডাউন বা সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শুধু দেশটি নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। শাটডাউনের কারণে বন্ধ রয়েছে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকগুলোর তথ্য প্রকাশ। জাপান, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোও এসব ডাটার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে দেশগুলো অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে জটিলতায় পড়েছে। খবর রয়টার্স।
শুল্কসহ নানাবিধ ইস্যুতে অনেক দেশই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। মার্কিন তথ্যপ্রবাহ বন্ধ থাকায় অন্যান্য দেশের বিনিময় হার, বাণিজ্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কাজুও উএদা বলেন, ‘এটি একটি গুরুতর সমস্যা। আমরা আশা করি এ সংকট দ্রুত সমাধান হবে।’
তিনি জানান, মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্যের অনুপস্থিতি জাপানের পক্ষে সুদহার পুনর্মূল্যায়নের সময় নির্ধারণকে জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শাটডাউনের সমালোচনা করে এক জাপানি নীতিনির্ধারক বলেন, ‘এটি একেবারে হাস্যকর ব্যাপার। ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সবসময় বলেন, নীতি নির্ভর করে তথ্যের ওপর। কিন্তু এখন তো কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না!’
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সদস্য ক্যাথরিন ম্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য সংকট বা ফেডের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক সরাসরি যুক্তরাজ্যের নীতিতে প্রভাব ফেলে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ সংকট ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করতে পারে। যেভাবে ধীরে ধীরে পাউন্ড কেন্দ্রীয় ভূমিকা হারিয়েছিল, তেমনি নানা ছোট ছোট পরিবর্তন ডলারের শক্তিক্ষয় ঘটাতে পারে।’
ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় জড়ো হয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ অর্থমন্ত্রী ও ব্যাংকাররা। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি, সরকারি তথ্য বন্ধ থাকা ও ফেডের ওপর রাজনৈতিক চাপ।
যদিও মার্কিন সরকার যেকোনো সময় আবার কাজ শুরু করতে পারে, পুনরায় চালু হতে পারে তথ্য প্রকাশও। তবু এ পরিস্থিতি মার্কিন প্রশাসন ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা ফেডের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। সেই সঙ্গে চাকরির প্রতিবেদন মনঃপূত না হওয়ায় ট্রাম্পের চাপে মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধানের পদত্যাগও উদ্বেগ তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিকে ‘বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য নেতিবাচক ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে আইএমএফ। এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়লে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর বিশ্বাস কমাবে। এটি ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ঝুঁকি বাড়াবে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে সব তথ্য প্রকাশ বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে ফেড। পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা থেকে বিকল্প ডাটা নেয়া হচ্ছে, তবে তা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়।
অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম পোসেন বলেন, ‘তথ্যপ্রবাহ বন্ধ হওয়ায় মার্কিন প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে। এটি ভবিষ্যতে মুদ্রা বিনিময় হার ও বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলবে।’
আইএমএফর সাম্প্রতিক বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা আগের পূর্বাভাস থেকে সামান্য বেশি। তবে মার্কিন অর্থনীতির তথ্যপ্রবাহ যতদিন বন্ধ থাকবে, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ঝুঁকি ও অনিশ্চতার বিষয়ে ইউরেশিয়া গ্রুপের রবার্ট কাহন বলেন, ‘নীতিনির্ধারকরা এখনো নানা উৎস থেকে তথ্য জোগাড় করছেন। কিন্তু যত সময় যাবে, অনিশ্চয়তা বাড়বে, আর ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে।